Showing posts with label Poem. Show all posts
Showing posts with label Poem. Show all posts

5 March 2015

তুমি হাতখানি রাখো

প্রিয়তমা, তুমি হাতখানি রাখো আমার গুমোট বুকে।
শুনতে পাচ্ছো শব্দ? কে যেনো হাতুড়ি ঠুকে চলছে?
সেখানে এক মিস্ত্রি থাকে,যে বানিয়ে চলেছে
এক শবাধার ।
কার জন্যে জানো?—– আমার, আমার ।

উল্লাসে বিদ্বেষে নিরন্তর সে হাতুড়ি
ঠুকছে দুই হাতে,
কিছুতে ঘুমোতে পারছিনা আমি,
দিনে কিংবা রাতে।

মিস্ত্রি, দ্রুত করো, তুমি কাজ
শেষ করো তাড়াতাড়ি,
যাতে আমি অবশেষে শান্তিতে ঘুম যেতে পারি । ।

_______________________________
(হুমায়ুন আজাদ)

4 March 2015

আমি সম্ভবত

আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্য মারা যাবো
ছোট ঘাসফুলের জন্যে
একটি টলোমলো শিশিরবিন্দুর জন্যে
আমি হয়তো মারা যাবো চৈত্রের বাতাসে
উড়ে যাওয়া একটি পাঁপড়ির জন্যে
একফোঁটা বৃষ্টির জন্যে

আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্যে মারা যাবো
দোয়েলের শিসের জন্যে
শিশুর গালের একটি টোলের জন্যে
আমি হয়তো মারা যাবো কারো চোখের মণিতে
গেঁথে থাকা একবিন্দু অশ্রুর জন্যে
একফোঁটা রৌদ্রের জন্যে

আমি সম্ভবতখুব ছোট্ট কিছুর জন্যে মারা যাবো
এক কণা জ্যোৎস্নার জন্যে
এক টুকরো মেঘের জন্যে
আমি হয়তো মারা যাবো টাওয়ারের একুশ তলায়
হারিয়ে যাওয়া একটি প্রজাপতির জন্যে
এক ফোঁটা সবুজের জন্যে

আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্যে মারা যাবো
খুব ছোট একটি স্বপ্নের জন্যে
খুব ছোট দুঃখের জন্যে
আমি হয়তো মারা যাবো কারো ঘুমের ভেতরে
একটি ছোটো দীর্ঘশ্বাসের জন্যে
একফোঁটা সৌন্দর্যের জন্যে।
___________________________________
(হুমায়ুন আজাদ)

4 November 2011

হায়দার হুসেইন: তিরিশ বছর

তিরিশ বছর


কি দেখার কথা কি দেখছি? কি শোনার কথা কি শুনছি?
কি ভাবার কথা কি ভাবছি? কি বলার কথা কি বলছি?
তিরিশ বছর পরেও আমি স্বাধীনতাটাকে খুঁজছি।।
স্বাধীনতা কি বৈশাখী মেলা, পান্তা ইলিশ খাওয়া?
স্বাধীনতা কি বটমূলে বসে বৈশাখী গান গাওয়া?
স্বাধীনতা কি বুদ্ধিজীবির বক্তৃতা সেমিনার?
স্বাধীনতা কি শহীদ বেড়িতে পুষ্পের সমাহার?
স্বাধীনতা কি গল্প নাটক উপন্যাস আর কবিতা?
স্বাধীনতা কি আজ বন্দী আনুষ্ঠানিকতা?
স্বাধীনতা কি ঢাকা শহরের আকাশচুম্বী বাড়ি?
স্বাধীনতা কি ফুটপাতে শোয়া গৃহহীন নর-নারী?
স্বাধীনতা কি হোটেলে হোটেলে গ্র্যান্ড ফ্যাশন শো?
স্বাধীনতা কি দুখিনী নারীর জড়-জীর্ণ বস্ত্র?
স্বাধীনতা কি গজিয়ে ওঠা অভিজাত পান্থশালা?
স্বাধীনতা কি অন্যের খোঁজে কিশোরী প্রমোদবালা?
স্বাধীনতা কি নিরীহ লোকের অকারণে প্রাণদন্ড?
স্বাধীনতা কি পানির ট্যাঙ্কে গলিত লাশের গন্ধ?
স্বাধীনতা কি হরতাল ডেকে জীবন করা স্তব্ধ?
স্বাধীনতা কি ক্ষমতা হরণে চলে বন্দুক যুদ্ধ?
স্বাধীনতা কি সন্ত্রাসী হাতে মারণাস্ত্রের গর্জন?
স্বাধীনতা কি অর্থের লোভে বিবেক বিসর্জন?
আজ নেই বর্গী, নেই ইংরেজ, নেই পাকিস্তানী হানাদার,
আজো তবু কেন আমার মনে শূণ্যতা আর হাহাকার?
আজো তবু কি লাখো শহীদের রক্ত যাবে বৃথা?
আজো তবু কি ভুলতে বসেছি স্বাধীনতার ইতিকথা?

(গান: হায়দার হুসেইন)

নচিকেতা: বৃদ্ধাশ্রম


বৃদ্ধাশ্রম

ছেলে আমার মস্ত মানুষ,মস্ত অফিসার
মস্ত ফ্ল্যাটে যায় না দেখা এপার ওপার।
নানান রকম জিনিস আর আসবাব দামী দামী
সবচেয়ে কম দামী ছিলাম একমাত্র আমি।
ছেলের আমার আমার প্রতি অগাধ সম্ভ্রম
আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম।।
আমার ব্যবহারের সেই আলমারি আর আয়না
ওসব নাকি বেশ পুরনো,ফ্ল্যাটে রাখা যায় না।
ওর বাবার ছবি,ঘড়ি-ছড়ি,বিদেয় হলো তাড়াতাড়ি
ছেড়ে দিলো, কাকে খেলো, পোষা বুড়ো ময়না।
স্বামী-স্ত্রী আর আ্যালসেশিয়ান-জায়গা বড়ই কম
আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম।।
নিজের হাতে ভাত খেতে পারতো নাকো খোকা
বলতাম আমি না থাকলে কি করবি রে বোকা?
ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদতো খোকা আমার কথা শুনে-
খোকা বোধ হয় আর কাঁদে না,নেই বুঝি আর মনে।
ছোট্টবেলায় স্বপ্ন দেখে উঠতো খোকা কেঁদে
দু’হাত দিয়ে বুকের কাছে রেখে দিতাম বেঁধে
দু’হাত আজো খুঁজে,ভুলে যায় যে একদম-
আমার ঠিকানা এখন বৃদ্ধাশ্রম।।
খোকারও হয়েছে ছেলে,দু’বছর হলো
তার তো মাত্র বয়স পঁচিশ,ঠাকুর মুখ তোলো।
একশো বছর বাঁচতে চাই এখন আমার সাধ
পঁচিশ বছর পরে খোকার হবে ঊনষাট।
আশ্রমের এই ঘরটা ছোট,জায়গা অনেক বেশি-
খোকা-আমি,দু’জনেতে থাকবো পাশাপাশি।
সেই দিনটার স্বপ্ন দেখি ভীষণ রকম
মুখোমুখি আমি,খোকা আর বৃদ্ধাশ্রম!
মুখোমুখি আমি,খোকা আর বৃদ্ধাশ্রম!
মুখোমুখি আমি,খোকা আর বৃদ্ধাশ্রম।।

(গান: নচিকেতা)

Anjan Datta: মিসেস মুখার্জী

মিসেস মুখার্জী

সাবধান মিসেস মুখার্জী একটু ভেবে দেখবেন
মেয়েটি যে আপনার হচ্ছে বড় সে তো নয় ফাউন্টেন পেন
আগলে আগলে রেখে আঁচলের তলায় ধরে রাখা যায় না সময়
চোখে চোখে রাখা মানেই কিন্তু মনে ধরে রাখা নয়
সাবধান মিসেস মুখার্জী তাকিয়ে দেখুন একবার
বলতে কি চায় চোখ দুটো তার চাপা অহংকার
জামার মাপটা তার জানেন ভালোই মনের খবর কি রাখেন
সাবধান মিসেস মুখার্জী সাবধান মিসেস সেন।
বড় হয়ে যাচ্ছে মন
বড় বড় স্বপ্ন সে দেখতে শিখছে এখন
পৃথিবীটা তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে
মানবে কি করে সে বলুন
আপনার ছোট খাটো শাসন।।
সময়ের মার নেই বলছি যে তাই এখনো সময় আছে
যতই তাকে আগলে রাখুন নাচ আর গানের ক্লাসে
অন্ধ যে নয় তার চোখ দুটো তাই বন্ধ যে নয় তার মন
সেই মনের সাথে কত হাজার কথা হয় তার যখন তখন
ষোল বছরের এই মনটার ভেতরে রোজ রোজ কত কি ঘটে
কত কত স্বপ্নকে জন্ম সে দেয় কত স্বপ্ন কে দেয় পুড়িয়ে
একদিন মনের এই শ্মশানটা যদি দাউদাউ করে জ্বলে উঠে
সাবধান মিসেস মুখার্জী সাবধান মিসেস সেন।
বড় হয়ে যাচ্ছে মন
বড় বড় স্বপ্ন সে দেখতে শিখছে এখন
পৃথিবীটা তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে
মানবে কি করে সে বলুন
আপনার ছোট খাটো শাসন।।
ন’ নটা মাস ধরে পেটের ভেতর নিয়ে হাজার যন্ত্রনা
একটু একটু করে একদিন আপনি হয়ে গেলেন মা
একটু একটু করে যৌবন আপনার কোথায় গেলো হারিয়ে
স্বপ্ন দেখার সেই মনটাও কেমন হয়ে গেলো ঘোলাটে
বদলে গেছে সময়টা নাকি আপনি বদলে গেছেন
ষোল বছরের সেই স্বপ্নগুলো আপনি ভুলে বসেছেন
বলতেই পারেন আমার এই গানের নেই কোন মুন্ডু মানে
তবে সাবধান মিসেস দত্ত সাবধান মিসেস সেন।
বড় হয়ে যাচ্ছে মন
বড় বড় স্বপ্ন সে দেখতে শিখছে এখন
পৃথিবীটা তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে
মানবে কি করে সে বলুন
আপনার ছোট খাটো শাসন।।

(গান: অঞ্জন দত্ত)

Anjan Datta: কাঞ্চনজংঘা

একটু ভালো করে বাঁচবো বলে আর একটু বেশী রোজগার
ছাড়লাম ঘর আমি ছাড়লাম ভালোবাসা আমার নীলচে পাহাড়।
পারলো না কিছুতেই তোমার কোলকাতা আমাকে ভুলিয়ে দিতে
পাহাড়ি রাস্তার ধারের বস্তির আমার কাঞ্চনকে।
কাঞ্চন জানা কাঞ্চন ঘর, কাঞ্চনজংঘা কাঞ্চন মন
তো পাইলে সোনা অনু লইয়ো মউল্লা হাঙচুকাঞ্চন।।
সোনার খোঁজে কেউ কতদূর দেশে যায় আমি কোলকাতায়
সোনার স্বপ্ন খুঁজে ফিরি একা একা তোমাদের ধর্মতলায়।
রাত্রির নেমে এলে তিনশো বছরের সিমেন্টের জঙ্গলে
ফিরে চলে যাই সেই পাহাড়ি বস্তির কাঞ্চনের কোলে।
জং ধরা রঙ চটা পার্কের বেঞ্চিটা আমার বিছানা
কখন যে তুলে নিয়ে গিয়েছিলো আমাকে তোমাদের থানা
তিন মাস জেল খেটে এখন আমি সেই থানার দারোয়ান
পারবো না ফিরে পেতে হয়তো কোনোদিন আমার সেই কাঞ্চন।
কাঞ্চন জানা কাঞ্চন ঘর, কাঞ্চনজংঘা কাঞ্চন মন
তো পাইলে সোনা অনু লইয়ো মউল্লা হাঙচুকাঞ্চন।।
বেড়াতে যদি তুমি যাও কোনোদিন আমার ক্যালিংপঙ
জেনে রেখো শংকর হোটেলের ভাড়া ট্যুরিস্ট লজের থেকে কম
রাত্রির নেমে এলে আসবে তোমার ঘরে চুল্লিটা জ্বালিয়ে দিতে
আর কেউ নয় সে যে আমার ফেলে আসা নীলচে পাহাড়ি মেয়ে।
বলো না তাকে আমি দারোয়ান শুধু বলে করছি ভালোই রোজগার
ঐ বস্তির ড্রাইভার চিগমির সাথে যেন বেঁধে না ফেলে সংসার
আর কিছু টাকা আমি জমাতে পারলে যাবো যাবো ফিরে
পাহাড়ি রাস্তার ধারের বস্তির আমার নিজের ঘরে।
আর যদি দেখ তার কপালে সিঁদুর বলো না কিছু তাকে আর
শুধু এই সত্তর টাকা তুমি যদি পারো গুজে দিও হাতে তার
ট্রেনের টিকিটের ভাড়াটা সে দিয়েছিলো কানের মাকড়ী বেঁচে
ভালোবাসার সেই দাম তুমি দিয়ে দিও আমার কাঞ্চনকে।।
কাঞ্চন জানা কাঞ্চন ঘর, কাঞ্চনজংঘা কাঞ্চন মন
তুমি যাকে বলো সোনা আমি তাকে বলি কাঞ্চন।
কাঞ্চন জানা কাঞ্চন ঘর, কাঞ্চনজংঘা কাঞ্চন মন
তো পাইলে সোনা অনু লইয়ো মউল্লা হাঙচুকাঞ্চন।।

(গান: অঞ্জন দত্ত)

দলছুট: গাড়ি চলে না

গাড়ি চলে না


গাড়ি চলে না চলে না,
চলে না রে, গাড়ি চলে না।
চড়িয়া মানব গাড়ি
যাইতেছিলাম বন্ধুর বাড়ি
মধ্য পথে ঠেকলো গাড়ি
উপায়-বুদ্ধি মেলে না।।
মহাজনে যতন করে
তেল দিয়াছে টাংকি ভরে
গাড়ি চালায় মন ড্রাইভারে
ভালো-মন্দ বোঝে না।।
ইঞ্জিনে ময়লা জমেছে
পার্টসগুলো ক্ষয় হয়েছে
ডাইনামো বিকল হয়েছে
হেডলাইট দুইটা জ্বলে না।।
ইঞ্জিনে ব্যতিক্রম করে
কন্ডিশন ভালো নয় রে
কখন জানি ব্রেক ফেল করে
ঘটায় কোন্‌ দুর্ঘটনা।।
আবুল করিম ভাবছে এইবার
কোন্‌ দিন গাড়ি কি করবে আর
সামনে বিষম অন্ধকার
করতেছে তাই ভাবনা।।

(গান: দলছুট)

Song Lyric: Ascha keno

আচ্ছা কেন মানুষগুলো


আচ্ছা কেন মানুষগুলো এমন হয়ে যায়
চেনাজানা মুখগুলো সব কেমন হয়ে যায়
দিন বদলের খেলাতে
মন বদলের মেলাতে
মানুষগুলো দিনে দিনে
বদলে কেন যায়।।
সুখের দিনে ভালোবাসা দেয় যে কতজন
কাছে আসে ভালোবাসে দেয় যে ভরে মন
দিন বদলের খেলাতে
মন বদলের মেলাতে
মানুষগুলো দিনে দিনে
বদলে কেন যায়।।
দুঃখের দিনে কাছে এসে পথ ভুলে কি কেউ
একা ঘরে পড়েই রবে জানবে নাতো কেউ
দিন বদলের খেলাতে
মন বদলের মেলাতে
মানুষগুলো দিনে দিনে
বদলে কেন যায়।।

(গান: রেনেসাঁ)

সুকুমার রায়

ভয় পেয়ো না
সুকুমার রায়

ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না, তোমায়
আমি মারব না,
সত্যি বলছি কুস্তি করে তোমার
সঙ্গে পারব না ।
মনটা আমার বড্ড নরম, হাড়ে আমার
রাগটি নেই,
তোমায় আমি চিবিয়ে খাবো এমন আমার
সাধ্যি নেই ।
মাথায় আমার শিং দেখে ভাই ভয় পেয়েছ কতই না -
জানো না মোর মাথায় ব্যারাম কাউকে আমি গুঁতোই না ?
এসো এসো র্গতে এসো বাস করে যাও
চারটি দিন,
আদর করে শিকেয় তুলে রাখব তোমায়
রাত্রি দিন ।
হাতে আমার মুগুর আছে তাই কি হেথায়
থাকবে না ?
মুগুর আমার হাল্কা এমন মারলে তোমার
লাগবে না ।
অভয় দিচ্ছি শুনছ না যে ? ধরব
নাকি ঠ্যাং দুটা ?
বসলে তোমার মুন্ডু চেপে বুঝবে তখন
কান্ড টা ।
আমি আছি, গিন্নী আছেন, আছেন আমার
নয় ছেলে,
সবাই মিলে কামড়ে দেব, মিছে অমন
ভয় পেলে ।


18 October 2011

Shukanta Bhattacharya

হে মহাজীবন

সুকান্ত ভট্টাচার্য



হে মহামানব, আর এ কাব্য নয়
এবার কঠিন কঠোর গদ্যে আনো,
পদ-লালিত্য ঝঙ্কার মুছে যাক
গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো।
প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা-
কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়:
পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।

23 September 2011

Farhad Mazhar

কর্তৃত্ব গ্রহণ কর, নারী
ফরহাদ মজহার

আমি তোমার সামনে আবার নতজানু হয়েছি, নারী
না, প্রেমে নয়, আশ্লেষে নয়,
ক্ষমা চেয়ে
তোমার দয়া দিয়ে আমার হৃদয় ধুয়ে দেবার প্রার্থনায়
আমার ভেতরে যে পুরুষ তাকে আমি চাবুক মেরে শাসন করেছি
তাকে হাঁটু মুড়ে বসতে বলেছি তোমার সামনে
আমি ক্ষমা চাই, ক্ষমা করে দাও
শুধু আমাকে নয়
সমস্ত পুরুষকে তুমি ক্ষমা কর
আমি আজ সমস্ত পুরুষের হয়ে তোমার ক্ষমাপ্রার্থী

পুরুষ তোমার সামনে আবার
নতজানু হয়েছে নারী,
তাকে ক্ষমা করে দাও।

গৃহপালিত পশুর মতো তোমাকে ব্যবহার করেছে পুরুষ
আখমাড়াইয়ের কারখানার মতো তোমার জানু চেপে
তারা উৎপাদন করেছে সন্তান
টেলিভিশন বাক্সের মতো তোমার ভেতর তারা ঠেসে দিয়েছে
তাদের জগত
নীলাভ শিখার মতো জ্বলতে জ্বলতে তুমি তা প্রতিদিন
প্রচার করে যাচ্ছ-
ইলেকট্রনিক সরঞ্জামের মতো অপ্রাণীবাচক তোমার অস্তিত্ব
প্লাস্টিকের পুতুলের মতো প্রাণহীন
তোমার নাম হতে পারত কাঠকয়লা
তোমার নাম হতে পারত হাতুড়ি
তোমার নাম হতে পারত শেলাইকল
তোমার নাম হতে পারত মাদীকুকুর
নরবানরেরা ঠাট্টা করে তোমার নাম রেখেছে নারী
এইসব জেনে তোমার সামনে আমি
নতমুখে এসে দাঁড়িয়েছি, নারী
আমি পুরুষ
আমাকে ক্ষমা কর।

প্রতিদিন কেউ-না-কেউ স্বামী তার স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা করে
প্রতিদিন কেউ-না-কেউ পশুস্বভাবী কামুক
তোমার মুখে এসিড ছুঁড়ে মারে
প্রতিদিন ১১ বছর বয়সী বালিকাকে
ধর্ষণ করে ১১জন পুরুষ
কেনাবেচা চলছে তোমাকে নিয়ে
যেন তুমি শাকশব্জি
আলুপটল
খাসীর মাংস
তোমার স্তন তারা মাপছে ফিতে দিয়ে
তোমার কোমর তারা মাপছে ফিতে দিয়ে
তোমার উরু তারা মাপছে ফিতে দিয়ে
দাঁড়িপাল্লা ঝুলিয়ে ওজন করছে তোমাকে
তোমার দাঁত চুল নখ পরখ করে সাব্যস্ত করছে
তোমার মূল্য

তোমার নাম হতে পারত মোগলাই পরোটা
তোমার নাম হতে পারত জাপানি হোন্ডা
তোমার নাম হতে পারত ডানহিল সিগারেট
তোমার নাম হতে পারত পুষিবিড়াল
অর্ধসভ্য মানুষ তোমার নাম রেখেছে অর্ধাঙ্গিনী

এইসব জেনে তোমার সামনে আমি
নতমুখে এসে দাঁড়িয়েছি, নারী

আমি পুরুষ
আমাকে ক্ষমা কর।
তুমি প্রজননযন্ত্র তাই তোমার নাম জননী
তুমি রমণযোগ্য তাই তোমার নাম রমণী
ঘোড়াশালে ঘোড়া হাতিশালে হাতির মতো মহলে মহলে থাকো
তাই তোমার নাম মহিলা
গৃহে গৃহে আসবাবপত্রের মত শোভা পাও
তাই তোমার নাম গৃহিণী
আমি পুরুষ শব্দের সমান অর্থবহ উচ্চারণে,
তোমার নামকরণ করতে চাই, নারী
কিন্তু পারি না
অক্ষম লজ্জায় আমি তোমার সামনে
অপরাধীর মত দাঁড়িয়ে আছি
আমি পুরুষ
আমাকে ক্ষমা কর।

আজ আমি তোমাকে বলতে এসেছি
পুরুষ শব্দের অর্থ হচ্ছে কর্তৃত্ব
এবং তোমার কর্তৃত্ব গ্রহণ করার সময় হয়েছে, নারী

পুরুষকে গ্রহণ কর।



18 September 2011

জীবনানন্দ দাশ

তুমি শুধু এক দিন — এক রজনীর!–

জীবনানন্দ দাশ
মানুষের মানুষীর ভিড়
তোমারে ডাকিয়া লয় দূরে — কত দূরে!
কোন্‌ সমুদ্রের পারে — বনে — মাঠে — কিংবা যে আকাশ জুড়ে
উল্কার আলেয়া শুধু ভাসে! —
কিংবা যে আকাশে
কাস্তের মতো বাঁকা চাঁদ
জেগে ওঠে, ডুবে যায় — তোমার প্রাণের সাধ
তাহাদের তরে!
যেখানে গাছের শাখা নড়ে
শীত রাতে — মড়ার হাতের শাদা হাড়ের মতন! —
যেইখানে বন
আদিম রাত্রির ঘ্রাণ
বুকে লয়ে অন্ধকারে গাহিতেছে গান!–
তুমি সেইখানে!
নিঃসঙ্গ বুকের গানে
নিশীথের বাতাসের মতো
একদিন এসেছিলে —
দিয়েছিলে এক রাত্রি দিতে পারে যত!


জীবনানন্দ দাশ

সহজ 
জীবনানন্দ দাশ

আমার এ গান
কোনোদিন শুনিবে না তুমি এসে–
আজ রাত্রে আমার আহ্বান
ভেসে যাবে পথের বাতাসে–
তবুও হৃদয়ে গান আসে!
ডাকিবার ভাষা
তবুও ভুলি না আমি–
তবু ভালোবাসা
জেগে থাকে প্রাণে!
পৃথিবীর কানে
নক্ষত্রের কানে
তবু গাই গান!
কোনোদিন শুনিবে না তুমি তাহা, জানি আমি–
আজ রাত্রে আমার আহ্বান
ভেসে যাবে পথের বাতাসে–
তবুও হৃদয়ে গান আসে!

তুমি জল, তুমি ঢেউ, সমুদ্রের ঢেউয়ের মতন
তোমার হেদের বেগ– তোমার সহজ মন
ভেসে যায় সাগরের জলে আবেগে!
কোন্‌ ঢেউ তার বুকে গিয়েছিল লেগে
কোন্‌ অন্ধকারে
জানে না সে!– কোন ঢেউ তারে
অন্ধকারে খুজিছে কেবল
জানে না সে! রাত্রির সিন্ধুর জল,
রাত্রির সিন্ধুর ঢেউ
তুমি একা! তোমারে কে ভালোবাসে! — তোমারে কি কেউ
বুকে করে রাখে!
জলের আবেগে তুমি চলে যাও —
জলের উচ্ছ্বাসে পিছে ধু ধু জল তোমারে যে ডাকে!


14 September 2011

নির্মলেন্দু গুন

আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি 
নির্মলেন্দু গুন

সমবেত সকলের মতো আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি,
রেসকোর্স পার হয়ে যেতে সেইসব গোলাপের একটি গোলাপ
গতকাল আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।

শহিদ মিনার থেকে খসে-পড়া একটি রক্তাক্ত ইট গতকাল আমাকে বলেছে,
আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।
সমবেত সকলের মতো আমিও পলাশ ফুল খুব ভালোবাসি, ‘সমকাল’
পার হয়ে যেতে সদ্যফোটা একটি পলাশ গতকাল কানে কানে
আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।

শাহবাগ এ্যভিন্যুর ঘূর্ণায়িত জলের ঝরনাটি আর্তস্বরে আমাকে বলেছে,
আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।

সমবেত সকলের মতো আমারো স্বপ্নের প্রতি পক্ষপাত আছে,
ভালোবাসা আছে_ শেষ রাতে দেখা একটি সাহসী স্বপ্ন গতকাল
আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।

এই বসন্তের বটমূলে সমবেত ব্যথিত মানুষগুলো সাক্ষী থাকুক,
না-ফোটা কৃষ্ণচূড়ার শুষ্কভগ্ন অপ্রস্তুত প্রাণের ঐ গোপন মঞ্জরীগুলো কান পেতে শুনুক,
আসন্ন সন্ধ্যার এই কালো কোকিলটি জেনে যাক_
আমার পায়ের তলায় পুণ্য মাটি ছুঁয়ে
আমি আজ সেই গোলাপের কথা রাখলাম, আজ সেই পলাশের কথা
রাখলাম, আজ সেই স্বপ্নের কথা রাখলাম।

আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি,
আমি আমার ভালোবাসার কথা বলতে এসেছিলাম।

7 September 2011

নির্মলেন্দু গুণ

তোমার চোখ এতো লাল কেন
নির্মলেন্দু গুণ


আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে , আমি চাই
কেউ একজন আমার জন্য অপেক্ষা করুক,
শুধু ঘরের ভেতর থেকে দরোজা খুলে দেবার জন্য ।
বাইরে থেকে দরোজা খুলতে খুলতে আমি এখন ক্লান্ত ।


আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ আমাকে খেতে দিক । আমি হাতপাখা নিয়ে
কাউকে আমার পাশে বসে থাকতে বলছি না,
আমি জানি, এই ইলেকট্রিকের যুগ
নারীকে মুক্তি দিয়েছে স্বামী -সেবার দায় থেকে ।
আমি চাই কেউ একজন জিজ্ঞেস করুক :
আমার জল লাগবে কি না, নুন লাগবে কি না,
পাটশাক ভাজার সঙ্গে আরও একটা
তেলে ভাজা শুকনো মরিচ লাগবে কি না ।
এঁটো বাসন, গেঞ্জি-রুমাল আমি নিজেই ধুতে পারি ।


আমি বলছি না ভলোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ একজন ভিতর থেকে আমার ঘরের দরোজা
খুলে দিক । কেউ আমাকে কিছু খেতে বলুক ।
কাম-বাসনার সঙ্গী না হোক, কেউ অন্তত আমাকে
জিজ্ঞেস করুক : 'তোমার চোখ এতো লাল কেন ?'

সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

ছিন্নমুকুল
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

সবচেয়ে যে ছোট পিড়ি খানি
সেখানি আর কেউ রাখেনা পেতে,
ছোটথালায় হয় নাকো ভাতবাড়া
জল ভরে না ছোট্ট গেলাসেতে ।
বাড়ির মধ্যে সবচেয়ে যে ছোট
খাবার বেলা কেউ ডাকে না তাকে ।
সবচেয়ে যে শেষে এসেছিল,
তারই খাওয়া ঘুচেছে সব আগে ।


সবচেয়ে যে অল্পে ছিল খুশি,
খুশি ছিল ঘেষাঘেষির ঘরে,
সেই গেছে হায়, হাওয়ার সঙ্গে মিশে,
দিয়ে গেছে জায়গা খালি করে ।
ছেড়ে গেছে পুতুল, পুঁতির মালা,
ছেড়ে গেছে মায়ের কোলের দাবি ।
ভয়ভরা সে ছিল যে সব চেয়ে
সেই খুলেছে আঁধার ঘরের চাবি ।


হারিয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে ওরে !
হারিয়ে গেছে 'বোল' বলা সেই বাঁশি
দুধে ধোওয়া কচি সে মুখখানি
আঁচল খুলে হঠাৎ স্রোতের জলে
ভেসে গেছে শিউলী ফুলের রাশি ,
ঢুকেছে হায় শশ্মান ঘরের মাঝে
ঘর ছেড়ে হায় হৃদয় শশ্মানবাসী ।


সবচেয়ে যে ছোট কাপড়গুলি
সেইগুলি কেউ দেয় না মেলে ছাদে,
যে শয্যাটি সবার চেয়ে ছোট,
আজকে সেটি শূন্য পড়ে কাঁদে ।
সবচেয়ে যে শেষে এসেছিল
সেই গিয়েছে সবার আগে সরে ।
ছোট্ট যে জন ছিল রে সবচেয়ে,
সেই দিয়েছে সকল শূন্য করে ।

Abul Hasan

বদলে যাও, কিছুটা বদলাও
আবুল হাসান


কিছুটা বদলাতে হবে বাঁশী
কিছুটা বদলাতে হবে সুর
সাতটি ছিদ্রের সূর্য; সময়ের গাঢ় অন্তঃপুর
কিছুটা বদলাতে হবে


মাটির কনুই , ভাঁজ
রক্তমাখা দুঃখের সমাজ কিছুটা বদলাতে হবে...


বদলে দাও, তুমি বদলাও
নইলে এক্ষুনি
ঢুকে পড়বে পাঁচজন বদমাশ খুনী ,
যখোন যেখানে পাবে
মেরে রেখে যাবে,
তোমার সংসার, বাঁশী, আঘাটার নাও ।
বদলে যাও, বদলে যাও, কিছুটা বদলাও !

আবুল হাসান

গোলাপের নীচে নিহত হে কবি কিশোর

আবুল হাসান


গোলাপের নীচে নিহত হে কবি কিশোর আমিও ভবঘুরেদের প্রধান
ছিলাম ।
জোৎস্নায় ফেরা জাগুয়ারা চাঁদ দাঁতে ফালা ফালা করেছে আমারও
প্রেমিক হৃদয় !
আমিও আমার প্রেমহীনতায় গণিকার কাছে ক্লান্তি
সঁপেছি
বাঘিনীর মুখে চুমু খেয়ে আমি বলেছি আমাকে উদ্ধার দাও !
সক্রেটিসের হেমলক আমি মাথার খুলিতে ঢেলে তবে পান করেছি মৃত্যু
হে কবি কিশোর
আমারও অনেক স্বপ্ন শহীদ হয়েছে জীবনে কাঁটার আঘাত সয়েছি
আমিও ।
হৃদয়ে লুকানো লোহার আয়না ঘুরিয়ে সেখানে নিজেকে দেখেছি
পান্ডুর খুবই নিঃস্ব একাকী !
আমার পয়ের সমান পৃথিবী কোথাও পাইনি অভিমানে আমি
অভিমানে তাই
চক্ষু উপড়ে চড়ুইয়ের মতো মানুষের পাশে ঝরিয়েছি শাদা শুভ্র পালক !
হে কবি কিশোর নিহত ভাবুক, তেমার দুঃখ আমি কি বুঝি না ?
আমি কি জানি না ফুটপাতে কারা করুণ শহর কাঁধে তুলে নেয় ?
তোমার তৃষ্ণা তামার পাত্রে কোন কবিতার ঝিলকি রটায় আমি কি
জানি না
তোমার গলায় কোন গান আজ প্রিয় আরাধ্য কোন করতলও হাতে লুকায়
আমি কি জানি না মাঝরাতে কারা মৃতের শহর কাঁধে তুলে নেয় ?
আমারও ভ্রমণ পিপাসা আমাকে নারীর নাভিতে ঘুরিয়ে মেরেছে
আমিও প্রেমিক ক্রবাদুর গান স্মৃতি সমুদ্রে একা শাম্পান হয়েছি
আবার
সুন্দর জেনে সহোদরকেও সঘন চুমোয় আলুথালু করে খুঁজেছি
শিল্প ।
আমি তবু এর কিছুই তোমাকে দেবো না ভাবুক তুমি সেরে ওঠো
তুমি সেরে ওঠো তোমার পথেই আমাদের পথে কখনও এসো না,
আমাদের পথ
ভীষণ ব্যর্থ আমাদের পথ ।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

যদি নির্বাসন দাও
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরী ছোঁয়াবো
আমি বিষপান করে মরে যাবো ।
বিষন্ন আলোয় এই বাংলাদেশ
নদীর শিয়রে ঝুঁকে পড়া মেঘ
প্রান্তরে দিগন্ত নির্নিমেষ-
এ আমারই সাড়ে তিন হাত ভূম
যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরী ছোঁয়াবো
আমি বিষপান করে মরে যাবো ।
ধানক্ষেতে চাপ চাপ রক্ত
এইখানে ঝরেছিল মানুষের ঘাম
এখনো স্নানের আগে কেউ কেউ করে থাকে নদীকে প্রণাম
এখনো নদীর বুকে
মোচার খোলায় ঘুরে
লুঠেরা, ফেরারী ।
শহরে বন্দরে এত অগ্নি-বৃষ্টি
বৃষ্টিতে চিক্কণ তবু এক একটি অপরূপ ভোর,
বাজারে ক্রুরতা, গ্রামে রণহিংসা
বাতাবি লেবুর গাছে জোনাকির ঝিকমিক খেলা
বিশাল প্রাসাদে বসে কাপুরুষতার মেলা
বুলেট ও বিস্পোরণ
শঠ তঞ্চকের এত ছদ্মবেশ
রাত্রির শিশিরে কাঁপে ঘাস ফুল--
এ আমারই সাড়ে তিন হাত ভূমি
যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরী ছোঁয়াবো
আমি বিষপান করে মরে যাবো ।

কুয়াশার মধ্যে এক শিশু যায় ভোরের ইস্কুলে
নিথর দীঘির পারে বসে আছে বক
আমি কি ভুলেছি সব
স্মৃতি, তুমি এত প্রতারক ?
আমি কি দেখিনি কোন মন্থর বিকেলে
শিমুল তুলার ওড়াওড়ি ?
মোষের ঘাড়ের মতো পরিশ্রমী মানুষের পাশে
শিউলি ফুলের মতো বালিকার হাসি
নিইনি কি খেজুর রসের ঘ্রাণ
শুনিনি কি দুপুরে চিলের
তীক্ষ্ণ স্বর ?
বিষন্ন আলোয় এই বাংলাদেশ...
এ আমারই সাড়ে তিন হাত ভূমি
যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরী ছোঁয়াবো
আমি বিষপান করে মরে যাবো... ।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

কেউ কথা রাখেনি
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো কেউ কথা রাখেনি
ছেলেবেলায় এক বোষ্টুমি তার আগমনী গান হঠাৎ থামিয়ে বলেছিলো
শুক্লা দ্বাদশীর দিন অন্তরাটুকু শুনিয়ে যাবে
তারপর কত চন্দ্রভুক অমবস্যা এসে চলে গেল, কিন্তু সেই বোষ্টুমি আর এলো না
পঁচিশ বছর প্রতীক্ষায় আছি ।

মামাবাড়ির মাঝি নাদের আলী বলেছিল, বড় হও দাদাঠাকুর
তোমাকে আমি তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাবো
সেখানে পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমর খেলা করে !
নাদের আলি, আমি আর কত বড় হবো ? আমার মাথা এই ঘরের ছাদ
ফুঁরে আকাশ স্পর্শ করলে তারপর তুমি আমায় তিন প্রহরের বিল দেখাবে ?

একটাও রয়্যাল গুলি কিনতে পারিনি কখনো
লাঠি-লজেন্স দেখিয়ে দেখিয়ে চুষেছে লস্কর বাড়ির ছেলেরা
ভিখারীর মতন চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে দেখেছি ভেতরে রাস উৎসব
অবিরল রঙ্গের ধারার মধ্যে সুবর্ণ কঙ্কণ পড়া ফর্সা রমণীরা কতরকম আমোদে হেসেছে
আমার দিকে তারা ফিরেও চায়নি !
বাবা আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন, দেখিস, একদিন আমরাও...
বাবা এখন অন্ধ, আমাদের দেখা হয়নি কিছুই
সেই রয়্যাল গুলি, সেই লাঠি-লজেন্স, সেই রাস উৎসব
আমায় কেউ ফিরিয়ে দেবে না !

বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রেখে বরুণা বলেছিল,
যেদিন আমায় সত্যিকারের ভালবাসবে
সেদিন আমার বুকেও এরকম আতরের গন্ধ হবে !
ভালবাসার জন্য আমি হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়েছি
দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে বেঁধেছি লাল কাপড়
বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছি ১০৮ নীলপদ্ম
তবু কথা রাখেনি বরুণা, এখন তার বুকে শুধুই মাংসের গন্ধ
এখনো সে যে কোন নারী !
কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখে না !